বর্তমান সময়ে চাকরীর আবেদন করার নিয়মে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগের মত আর ব্যাংকে গিয়ে চালান দিয়ে নিজ হাতে আবেদন ফরম পুরণ করে ছবি, চালান, সার্টিফিকেট, নম্বরপত্র, নাগরিকত্ব ইত্যাদি সংযুক্ত করে পোস্ট অফিস মারফত পাঠানোর নিয়মের প্রচলন তেমন নেই। হয়ত হাজারে দুই একটা ম্যানুয়াল চাকরির আবেদন আছে কিন্তু বেশিরভাগই অনলাইনে সাবমিট করতে হয়। তাই একজন চাকরি প্রত্যাশি হিসেবে আপনার জেনে রাখা উচিত কোন সিস্টেমে আবেদন করলে তা নির্ভুল হবে। কিছু টিপস আজকে দিব। যেগুলো আপনার বেশ উপকারে দিবে। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক কিভাবে অনলাইনে নির্ভুলভাবে চাকরির আবেদন করতে হয়?
সঠিক চাকরির বিজ্ঞপ্তি খুঁজে পাওয়া
অনেকে সঠিক চাকরির বিজ্ঞপ্তি খুঁজে পাওয়াকে গুরুত্ব দেয় না কিন্তু এটাই প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখনকার সময়ে অনেক প্রতারক চক্র গড়ে উঠেছে যারা বিভিন্ন চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে চাকরির আবেদন করতে বলে। সেখানে তারা তাদের নিজেদের মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর দেয় এবং সে নম্বরে চাকরির ফি পরিশোধ করতে বলে। এভাবে তারা প্রতারিত করে। তাই একজন চাকরি প্রত্যাশি হিসেবে অনলাইনে নির্ভুলভাবে চাকরির আবেদন করতে হলে প্রথমেই আপনাকে সঠিক চাকরির বিজ্ঞপ্তি খুঁজে পেতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি চাকরির পোর্টাল, চাকরি বিজ্ঞপ্তি যে প্রতিষ্ঠান ছেড়েছে তা নিজস্ব ওয়েবসাইট, মেইন স্ট্রিম মিডিয়া বা প্রথম সারির যে সংবাদপত্রগুলো বিজ্ঞপ্তি ছাপায় তার উপর ভরসা করা যায়। বিঃদ্রঃ আবেদন করার শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা করবেন না, কেননা অনলাইন সার্ভারের বিষয়, দেখা গেল শেষ দিন অনেক আবেদনকারী (ট্রাফিক) -এর চাপে সার্ভারে আপনি ঢুকতে পারছেন না। তখন মূল্যবান সার্কুলারটা হাতছাড়া হয়ে যাবে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত চাহিদা সম্পর্কে জানা
চাকরি বিজ্ঞপ্তিতে চাকরির আবেদন করার জন্য কি কি প্রয়োজন তা উল্লেখ থাকে। যেমন: ছবি, স্বাক্ষর, চারিত্রিক সনদ, সার্টিফিকেট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন, নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট ইত্যাদি আপলোড করতে হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে এসব ডকুমেন্টের তথ্য পূরণ করতে হয়। তাই কি কি ডকুমেন্ট লাগবে তা বুঝতে হলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত চাহিদা সম্পর্কে জানতে হবে।
ছবি নির্বাচন ও সাইজ করা
চাকরির আবেদন করার জন্য সম্প্রতি তোলা ছবি নির্বাচন করবেন। অনেকে দু চার বছর আগের তোলা ছবি আপলোড করেন। এটা করবেন না। কেননা পরীক্ষার হলে আপনার ছবি সাথে বর্তমানের চেহারার মিল না পেলে না অসুবিধা এমনকি পরীক্ষা বাতিল পর্যন্ত হতে পারে। সাদা বা নীল কালারের শার্ট পা পাঞ্জাবী পরে ছবি তুলতে পারেন। এতে একটা মার্জিত লুক আসে। সাদা পোশাক হলে নীল ব্যাকগ্রাউন্ড দিবেন আর নীল পোশাক হলে সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড দিবেন। অধিকাংশ চাকরির আবেদনে 300X300 সাইজের ছবি আপলোড করতে বলে। আপনার বিভিন্ন অনলাইন টুলস কিংবা বিখ্যাত Adobe এর ওয়েবসাইট থেকে বিনামূল্যে আপনার ছবি রিসাইজ করতে পারবেন। আরেকটি বিষয় হলো ছবি সবসময় JPG বা PNG ফরম্যাটে সেভ করবেন। অধিকাংশ চাকরির আবেদনে শুধুমাত্র এ দুই ধরণের ফরম্যাট গ্রহণ করে। GIF বা AVIF ফরম্যাটে সেভ দিবেন না।
স্বাক্ষর নির্ধারণ ও সাইজ করা
অনেকে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগেন যে স্বাক্ষর কিভাবে করব? স্বাক্ষরে নিজের পুরো নাম লিখবো নাকি অনুস্বাক্ষর দিব? এসব প্রশ্নের উত্তর হলো আপনি চাইলে নিজের পুরো নাম লিখতে পারেন আবার চাইলে অনুস্বাক্ষরও দিতে পারেন। স্বাক্ষরের মূল বিষয় হলো যাচাই করা আপনি সঠিক প্রার্থী কিনা? আপনার আবেদন ফরমের স্বাক্ষরের সাথে পরীক্ষার হলে উপস্থিতিপত্রতে আপনার করা স্বাক্ষরের মিল করা হবে। আপনি যদি আবেদনের স্বাক্ষরের অনুরূপ স্বাক্ষর পরীক্ষার হলে করতে ব্যর্থ হন আপনার পরীক্ষা বাতিল করা হতে পারে। তাই যে স্বাক্ষরই করুন পরীক্ষার হলে যেন সেরূপ স্বাক্ষর করতে পারেন। একটি সাদা কাগজে আপনার স্বাক্ষর করার পর ছবি তুলে ইমেজ ফিল্টার করবেন যেন ব্যাকগ্রাউন্ড একদম সাদা আর আপনার স্বাক্ষের টেক্সট একদম কালো দেখায়। ইমেজ ফিল্টার করলে স্বাক্ষর একদম প্রফেশনাল দেখাবে। আপনি ফটোশপে Ctrl+L ব্যবহার করে টিউনিং করেও এ কাজ করতে পারেন। অধিকাংশ চাকরির আবেদনে 300X80 সাইজের ছবি চায় আপনি সেভাবেই ছবি রিসাইজ করে JPG বা PNG ফরম্যাটে সেভ করবেন।
তথ্য পূরণ করা
আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধনে উল্লেখিত তথ্য মোতাবেক ব্যাসিক ইনফরমেন বা মৌলিক তথ্যগুলো পূরণ করবেন। অনেকে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকেন আমার সার্টিফিকেটে আর এনআইডি কার্ডে পিতা-মাতার নাম বা ঠিকানা সামান্য ভুল বা দুই-একটা শব্দ অমিল আছে তাহলে আমি কোন তথ্য দিয়ে চাকরির আবেদন ফরম পূরণ করবো? এক্ষেত্রে আপনার জন্য সহজ পরামর্শ হলো যেটা নির্ভুল সেটা দিয়ে আপনি চাকরির আবেদন ফরম পূরণ করবেন। আর যেটা ভুল হয়েছে তা সংশোধন করার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। কর্তৃপক্ষের চাকরি প্রার্থীকে ভেরিফাই করার নানান উপায় আছে। পিতা মাতার নামে সামান্য অক্ষর ভুল কিংবা ঠিকানার সামান্য ভুলের জন্য আপনাকে চাকরি দেওয়া হতে বিরত রাখবেনা। সাবধানতার সাথে ফরমগুলো পূরণ করবেন। যদি ছোট হাতের লেখা চায় বা বড় হাতের লেখা চায় তা চাহিদা মত পূরণ করবেন। আর যে মোবাইল নম্বর সবসময় সচল থাকে সে নম্বর দিবেন। কেননা পরবর্তীতে সে নম্বরেই পরীক্ষার তারিখ, এডমিট ও রেজাল্ট সংক্রান্ত মেসেজ আসবে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বিবরণ সঠিকভাবে লিখুন
শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য পূরণের সময় পরীক্ষার নাম, প্রতিষ্ঠান, বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়, বিষয়, পাশের সাল, ফলাল, রোল নম্বর, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ইত্যাদি সঠিকভাবে লিখবেন। এক্ষেত্রে GPA, CGPA ভালোভাবে বুঝে পুরণ করবেন কেননা GPA হলো ৫.০০ এর মধ্যে হয় আর সিজিপিএ ৪.০০ এর মধ্যে। অনেক আবেদন ফরমে শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য নির্দিষ্ট ফরম্যাটে চাওয়া হয়। আবার বেশিরভাগ আবেদনে কম্পিউটার দক্ষতা চাওয়া হয়। আপনি কম্পিউটারে অফিস এ্যাপ্লিকেশন প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত না ডাটাবেজে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত না অন্য কোন ডিগ্রি আছে তা সঠিকভাবে উল্লেখ করুন। তাছাড়াও অন্য কোন কোম্পানী বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে অভিজ্ঞতার বিবরণে যুক্ত করুন। আর আপনি যদি যে প্রতিষ্ঠানের চাকরির আবেদন পূরণ করছেন সে প্রতিষ্ঠান বা মাদার-প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে ডিপার্টমেন্টাল ক্যান্ডিডেট = ইয়েস সিলেক্ট করবেন আর যদি আপনি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি না করেন তবে ডিপার্টমেন্টাল ক্যান্ডিডেট = নো সিলেক্ট করবেন।
আবেদন প্রিভিউ ও সাবমিট
সঠিকভাবে ফরম পূরণ করা হলে আপনি ছবি ও সিগনেচার আপলোড দিবেন। এরপর তথ্যগুলো ঠিকঠাক পূরণ করা হলো কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য শেষবারের মত আবেদন প্রিভিউ দেখে নিবেন। কেননা একবার ভুল আবেদন সাবমিট হয়ে গেলে তা সংশোধনের আর উপায় থাকেনা। আবেদন প্রিভিউ দেখে সব কিছু ঠিক আছে নিশ্চিত হলে ( আপনি আস্তিক হলে সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা করে) সাবমিট করুন।
আবেদন ফি পরিশোধ ও এ্যাপ্লিক্যান্ট কপি সংরক্ষণ
সঠিকভাবে আবেদন করা হলে আপনি একটি এ্যাপ্লিক্যান্ট কপি পিডিএফ ফরম্যাটে পাবেন। সেখানে একটি ইউজার আইডি পাবেন। এ্যাপ্লিক্যান্ট কপিতে উল্লেখিত নম্বরে প্রদত্ত এসএমএস ফরম্যাট মোতাবেক এসএমএস করবেন। তাহলে আপনি ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড মেসেজে পাবেন। যেটা সংরক্ষণ করা জরুরী। গুগল ড্রাইভ বা হার্ড ড্রাইভে চাকরির আবেদন নামে ফোল্ডার করে সেখানে নোটপ্যাডে যদি একেকটা চাকরির জন্য একেকটা ফাইল করেন, তাহলে তথ্য হারানোর ঝুকি থাকবেনা। পাশাপাশি নোটবুকে ম্যানুয়ালি হাতেও লিখে রাখতে পারেন। এ্যাডমিট তোলার সময় আবার ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড এর দরকার হবে। আরো পড়ুন যেভাবে ১০টি চাকরির আবেদনেই আপনার চাকরি নিশ্চিত করবেন
1 thought on “কিভাবে অনলাইনে নির্ভুলভাবে চাকরির আবেদন করতে হয়?”