চাকরি বর্তমানে সোনার হরিণ। বর্তমান সময়ে চাকরি পাইতে হলে আপনার শুধু একাডেমিক ডিগ্রি থাকলেই হবেনা বরং কিছু দক্ষতারও প্রয়োজন আছে। পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন করলে আপনি বিভিন্ন চাকরিতে সুবিধা পাবেন। যেমন এখন প্রতিটি চাকরিতে কম্পিউটারে দক্ষতা চাচ্ছে। বাংলায় ২৫ টি শব্দ ইংরেজিতে ৩০ টি শব্দ লেখতে পারার যোগ্যতা চায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তাই আপনাকে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এমনকি আপনি যদি চাকরি না-ও পান তবু স্বনির্ভর হতে পারবেন। ফ্রিল্যান্সিং কিংবা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের জন্য নিজে উদ্যোক্তা হতে পারবেন। নিচে এমন ৫টি কোর্স বা কোর্স-প্রোগ্রাম আলোচনা করবো, যেগুলো পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নে আপনার কাজে লাগবে।
১. কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন ও ডাটা এন্ট্রি
বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে কম্পিউটারে দক্ষতা চায়। বিশেষ করে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, কম্পিউটার অপারেটর, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, হিসাব সহকারী, প্রশাসনিক সহকারীসহ বিভিন্ন পদে যে বিপুল সংখ্যক লোক নিয়োগ দেওয়া হয় তার প্রধান শর্ত কম্পিউটারে দক্ষতা ও ৬ মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেট। Computer Office Application & Data Entry কোর্সের বিভিন্ন অংশের মধ্যেই ডাটা এন্ট্রির প্রয়োজনীয় দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। লেখার স্পিড বাড়ানোর জন্য কোন আঙ্গুল কিবোর্ডে কিভাবে রাখতে হয় এধরণের বিশেষ কৌশলও শেখানো হয়। বিশেষ করে MS Word-এ বাংলা ও ইংরেজি টাইপিং, MS Excel-এ তথ্য প্রবেশ করানো, ডাটা সাজানো, Sort ও Filter করা, Formula ব্যবহার, Tabulation Sheet তৈরি এবং Database-এ Record Entry করার মতো কাজ শেখানো হয়। ফলে অফিসের দৈনন্দিন ডাটা এন্ট্রি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি হয়। এ প্রশিক্ষণ নিলে আপনি চিঠিপত্র তৈরি করা, ক্যালেন্ডার বানানো, রেজাল্ট শীট তৈরি, বড় বড় হিসাব নিকাশ, ক্যালিব্রেশন, বই তৈরি করা, স্যালারি শীট তৈরি করাসহ বিভিন্ন অফিসিয়াল কাজে এক্সপার্ট হয়ে যাবেন। যদি ঠিকমত মনযোগ দিয়ে কোর্সটি কমপ্লিট করতে পারেন।
২. স্পোকেন ইংলিশ
ইংরেজিতে পড়তে ও লিখতে পারার পাশাপাশি ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা অর্জন করলে আপনি বাড়তি সুবিধা পাবেন। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষকতা করার সুযোগ হবে আপনার। আপনি সমাজবিজ্ঞানের স্যার হলেও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে তা ইংরেজিতে পড়াতে হবে। উচ্চশিক্ষা, চাকরি, ফ্রিল্যান্সিং, ব্যবসা কিংবা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইংরেজি দক্ষতার প্রয়োজন হয়। তাছাড়া দোভাষি হিসেবে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসেও কাজ করতে পারবেন। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি Spoken English শেখার দিকে মনোযোগ দিলে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। এছাড়াও উচ্চ শিক্ষায় বিভিন্ন Presentation, Group Discussion, Seminar ও Viva-তে ইংরেজিতে কথা বলার প্রয়োজন হয়। Spoken English বলতে মূলত ইংরেজি ভাষায় শোনা, বোঝা এবং সঠিক নিয়মে কথা বলার দক্ষতা বোঝায়। শুধু মুখস্থ করে ইংরেজি বাক্য বলা নয়; বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের বক্তব্য তৈরি করে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারাই এর মূল লক্ষ্য। স্পোকেন ইংলিশ শিখলে আপনি সঠিক উচ্চারণে ইংরেজি শিখতে পারবেন। আমরা সাধারণভাবে যে উচ্চারণে আসলে সেটা আসল ন্যাটিভ উচ্চারণ নয়, যেটা স্পোকেন ইংলিশ শিখলে আপনি জানতে পারবেন।
৩. গ্রাফিক ডিজাইন
গ্রাফিক ডিজাইন হলো ছবি, ব্যানার, পোস্টার, সাইনবোর্ড, ক্যালেন্ডার, জামা-কাপড়ের রং স্টাইল, টাইলস ডিজাইনসহ বিভিন্ন ডিজাইনের জন্য লেখা, কালার, আকৃতি, ছবিসহ বিভিন্ন ডিজাইন ও টেক্সচারের সমন্বয়ে একটি লুকিং দেওয়া তথা প্রয়োজনমাফিক লেখা, কালার, আকৃতি, ছবিসহ বিভিন্ন ডিজাইন ও টেক্সচার ইত্যাদির ব্যবহার। বর্তমানে পত্রিকা, অনলাইন জার্নাল, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পোস্ট দেয়ার জন্য সহ বিভিন্ন কোম্পানীর প্রোডাক্ট লেবেল, কৌটা, কার্টন, বয়্যাম, প্যাকেট, বস্তার উপর ডিজাইনের জন্য গ্রাফিক্স ডিজাইনারের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এছাড়াও প্রিন্টিং প্রেস, ডিজিটাল ব্যানার, ক্রেস্ট, গেঞ্জি প্রিন্ট, মগ প্রিন্ট সহ প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিক ডিজাইনারের চাহিদা বাড়ছে। Adobe Photoshop, Adobe Illustrator, Adobe InDesign যদি আপনি পড়াশোনার পাশাপাশি রপ্ত করতে পারেন ও আপনার ক্রিয়েটিভিটি থাকে এ কথা হলফ করে বলা যায় আপনাকে বসে থাকতে হবে না। আপনার কর্মসংস্থান হবেই। তাছাড়া এসব শিখে ফাইভার, আপওয়ার্ক এর মত গ্লোবাল মার্কেটপ্লেসেও ঘরে বসে বিভিন্ন দেশের ক্লায়েন্টদের কাজ করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতে পারেন। ফটোশপ শিখলে আপনি ছবি Crop ও Resize করা ছবির আলো ও রং সংশোধন Background পরিবর্তন বা অপসারণ ছবির বিভিন্ন অংশ Retouch করা Social Media Post তৈরি ব্যানার ও বিজ্ঞাপন ডিজাইন, Photo Manipulation, ওয়েব ও ডিজিটাল ব্যবহারের জন্য Graphics তৈরি শিখতে পারবেন। আর ইলাস্ট্রেটর শিখলে আপনি লোগো, আইকন, ইলাস্ট্রেশন, বিজনেস কার্ড, ভিজিটিং কার্ড, সাইনেজ এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডিং গ্রাফিক্স তৈরি করতে পারবেন। আরএর Adobe InDesign শিখলে আপনি বই ও ম্যাগাজিনের লেআউট, সংবাদপত্রের পৃষ্ঠা, ব্রোশিওর, ক্যাটালগ, কোম্পানির প্রোফাইল, রিপোর্ট, ই-বুক, মাল্টি-পেজ ডকুমেন্ট তৈরি করা শিখতে পারবেন।
৪. ওয়েব ডিজাইন, ডেভেলপমেন্ট এবং সাইবার সিকিউরিটি
বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বড় বড় কর্পোরেট হাউজ কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানে একজন দক্ষ ওয়েব মাস্টার প্রয়োজন হয়। কেননা এখন প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকে। এসব ওয়েবসাইট মেইটেন্যান্স এবং সাইবার থ্রেট থেকে সুরক্ষার জন্য একজন দক্ষ সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট দরকার হয়। তাছাড়া ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট শিখে প্যাসিভ উপার্জন, ফাইভার বা আপওয়ার্কের মত গ্লোবাল মার্কেটপ্লেসেও ফ্রিল্যান্সিং করতে পারেন।
ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্টে ওয়েবসাইট তৈরি ও পরিচালনার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো শেখানো হয়। সাধারণত HTML, CSS, JavaScript অথবা Bootstrap ফ্রেমওয়ার্ক দিয়ে ওয়েবসাইটকে সুন্দরভাবে ব্যবহার উপযোগি করা যায় শিখানো হয়। আবার কোন ক্লায়েন্ট যদি পিএসডি ফরম্যাটে কোন ডিজাইন দেয় সে মোতাবেক HTML,CSS ও JS দিয়ে ওয়েবসাইটে রূপান্তরও শিখানো হয়। পাশাপাশি কোডলেস WordPress, Domain-Hosting, Database, API, Front-End ও Back-End Development এবং ওয়েবসাইট প্রকাশের মৌলিক বিষয়ও শেখানো হয় (যদিও আরও এ্যাডভান্স বিষয় থাকে, যা প্রশিক্ষণপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ভেদে শিখানো হয়)।
সাইবার সিকিউরিটিতে কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক, ওয়েবসাইট ও তথ্যকে সাইবার থ্রেট থেকে সুরক্ষিত রাখার বিষয় শেখানো হয়। সাধারণত Networking, Linux, Operating System, Malware, Phishing, Password Security, Firewall, SSL, Encryption, Authentication, Web Security, Vulnerability এবং Security Monitoring-এর মৌলিক ধারণা দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিরাপদ ও অনুমোদিত পরিবেশে নিরাপত্তা পরীক্ষা ও ঝুঁকি শনাক্ত করার প্রাথমিক দক্ষতাও শেখানো হয়।

৫. ভিডিও এডিটিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন
বর্তমানে অনেকে পড়াশোনার পাশাপাশি কন্টেন্ট তৈরি করে লাখ লাখ টাকা ইনকাম করছে। সালমান মুক্তাদির, তাওহীদ আফ্রিদি কিন্তু শিক্ষাজীবন থেকেই ভিডিও এডিটিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন স্পেশালিস্ট ছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ভিডিও তৈরি, সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানও একজন দক্ষ কন্টেন্ট ক্রিয়েটর খোঁজে। নাটক, সিনেমা, এ্যানিমেশন, ভিএফএক্স ইত্যাদি একজন দক্ষ ভিডিও এডিটরের অনেক দাম। এছাড়াও নিজে সাবলম্বি হতে ও আত্ম কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে ভিডিও এডিটিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন শিখতে পারেন।
পরিশেষে বলব, এখানে যে ৫টি পয়েন্ট আলোচনা করলাম সবগুলোই কাজে দিবে। তবে আপনার ফোকাস অনুযায়ী যে কোন একটি প্রশিক্ষণ ভালোভাবে নিন। আপনার যদি সৃজনশীলতার ঘাটতি থাকে থাকে ১ ও ২ নং প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। আর আপনি সৃজনশীল হলে ৩-৫ নম্বরের মধ্যে যে কোন একটি প্রশিক্ষণ নিয়ে জীবন উজ্জ্বল করতে পারেন। আরো পড়তে পারেন “আসল ও নকল চাকরির বিজ্ঞাপন কিভাবে চিনবেন?”
3 thoughts on “পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সেরা ৫ টি কোর্স”