উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গমন, চাকরি কিংবা চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের পাসপোর্ট এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ডকুমেন্ট। অনেকেই মনে করেন পাসপোর্ট করতে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। কিন্তু মাত্র ৪ হাজার টাকায় পাসপোর্ট করবেন যেভাবে যদি না আপনি দালালের খপ্পরে পড়েন। দালালদের পাল্লায় না পড়ে অনলাইনে সঠিক ক্যাটাগরি নির্বাচন করে এবং নিজে অনলাইনে আবেদন করলে মাত্র ৪,০২৫ টাকা সরকারি ফি দিয়ে ৪৮ পৃষ্ঠার ৫ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট করা সম্ভব (ই-পাসপোর্ট মানে আবার ভার্চুয়াল পাসপোর্ট ভাববেন না, এটা স্মার্ট চিপসহ পাসপোর্ট)। ২০২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই ফি-এর মধ্যেই ১৫ শতাংশ ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাসপোর্ট ফি ৩৫০০ + দেশজ পণ্য ও সেবার ওপর মূসক ৫২৫ মোট ৪০২৫ টাকা খরচ।
কত বছর মেয়াদে ৪ হাজার টাকায় পাসপোর্ট করা যাবে?
২০২৬ সালের সরকারি ই-পাসপোর্ট ফি অনুযায়ী, বাংলাদেশে আবেদন করে ৪৮ পৃষ্ঠা ও ৫ বছর মেয়াদি Regular Delivery নির্বাচন করলে ফি ৪,০২৫ টাকা। অর্থাৎ, কম খরচে পাসপোর্ট করতে চাইলে এই অপশনটি বেছে নেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে ৪৮ পৃষ্ঠা ও ৫ বছর মেয়াদের Express Delivery-এর ফি ৬,৩২৫ টাকা এবং Super Express-এর ফি ৮,৬২৫ টাকা। একইভাবে ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের ফিও বেশি। তাই পাসপোর্ট দ্রুত পাওয়ার প্রয়োজন না থাকলে Regular Delivery তুলনামূলক কম খরচের বিকল্প। আপনি যদি আগে থেকে পদক্ষেপ নেন তাহলে তো আপনার Express Delivery-এর প্রয়োজন হচ্ছে না। তাই ৪ হাজার টাকায় পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব। আপনি এগুলো খরচ এ-চালানের ওয়েবসাইট থেকেও জানতে পারবেন। নিচে আমিও একটা তালিকা দিলাম।
| পাসপোর্ট | Regular | Express | Super Express |
|---|---|---|---|
| ৪৮ পৃষ্ঠা, ৫ বছর | ৪,০২৫ টাকা | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা |
| ৪৮ পৃষ্ঠা, ১০ বছর | ৫,৭৫০ টাকা | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা |
| ৬৪ পৃষ্ঠা, ৫ বছর | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা | ১২,০৭৫ টাকা |
| ৬৪ পৃষ্ঠা, ১০ বছর | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা | ১৩,৮০০ টাকা |
কারা ৪ হাজার টাকায় পাসপোর্ট করতে পারবেন?
সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ৪৮ পৃষ্ঠা, ৫ বছর মেয়াদি Regular Delivery নির্বাচন করলে ৪,০২৫ টাকা ফি প্রযোজ্য হতে পারে। আমার পরামর্শ হলো যারা শিক্ষার জন্য বিদেশ যাবেন তার ১০ বছরের পাসপোর্ট করবেন। আর যারা টুরিস্ট ভিসায় বিদেশ যাবেন আপনার ৫ বছরের করেন। শিক্ষার্থীর পড়াশোনা করতে বেশি সময় লাগবে তাই তাদের জন্য ১০ বছরের পাসপোর্টই উত্তম। আপনার মতামত নিচের কমেন্টে জানাতে পারেন। তাই আবেদন করার আগে নিজের বয়স, প্রয়োজন এবং পাসপোর্টের মেয়াদ বিবেচনা করা উচিত।
পাসপোর্ট করতে কী কী কাগজপত্র লাগবে?
৪ হাজার টাকায় পাসপোর্ট ই-পাসপোর্টের আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে রাখা উচিত। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদনকারীর পরিচয় যাচাইয়ের জন্য NID অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করা হয়:
- জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল কপি ও ফটোকপি
- অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদের ইংরেজি সংস্করণ
- অনলাইনে পূরণ করা আবেদন ফরমের প্রিন্ট কপি
- আবেদন Summary/Appointment-এর প্রিন্ট কপি
- পাসপোর্ট ফি প্রদানের প্রমাণ বা চালান, যদি অফলাইন পেমেন্ট করা হয়
- পূর্বের পাসপোর্ট, যদি থাকে
- সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য GO/NOC
- প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য প্রমাণপত্র
অনলাইনে পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম
পাসপোর্ট করতে হলে প্রথমেই অনলাইনে আবেদন করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের অফিসিয়াল ই-পাসপোর্ট পোর্টালে নতুন ই-পাসপোর্ট ও রি-ইস্যুর জন্য আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে।
ধাপ ১: অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন:
প্রথমে বাংলাদেশ ই-পাসপোর্টের অফিসিয়াল পোর্টালে প্রবেশ করুন। ঠিকানা: https://www.epassport.gov.bd/onboarding আবেদন করার আগে নিজের বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন করতে হবে। অর্থাৎ আপনি নাটোরের মানুষ কিন্তু বর্তমানে থাকেন রাজশাহী তাহলে আপনি রাজশাহী অফিস সিলেক্ট করবেন। আশা করছি বুঝতে পেরেছেন। পোর্টালে বর্তমান জেলা ও নিকটস্থ থানা নির্বাচন করার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস নির্ধারণ করতে পারবেন।

ধাপ ২: ব্যক্তিগত তথ্য সঠিকভাবে দিন
আবেদন ফরমে নিজের নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম, ঠিকানা, জাতীয়তা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। সব তথ্য NID অথবা জন্মনিবন্ধন সনদ অনুযায়ী পূরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এনআইডি ও জন্ম নিবন্ধনের তথ্য এক রকম হওয়া প্রয়োজন (আপনি আরো পড়তে পারেন: সহজ উপায়ে জন্ম নিবন্ধন সংশোধন ও নতুন আবেদনের নিয়ম ২০২৬)। সরকারি নির্দেশনাতেও আবেদনপত্র NID বা Online Birth Registration Certificate অনুযায়ী পূরণের কথা বলা হয়েছে। একটি অক্ষর বা জন্মতারিখের ভুলও ভবিষ্যতে সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই Submit করার আগে বানানসহ পুরো আবেদনটি ভালোভাবে যাচাই করুন।
ধাপ ৩: পাসপোর্টের ধরন নির্বাচন করুন
কম খরচে পাসপোর্ট করতে চাইলে ৪৮ পৃষ্ঠা, ৫ বছর মেয়াদি Regular Delivery নির্বাচন করা যায়। এই ক্যাটাগরির সরকারি ফি বর্তমানে ৪,০২৫ টাকা। এ জন্যই বলেছি ৪ হাজার টাকায় পাসপোর্ট শুধু ৫ বছরের জন্য। তবে কারও যদি ১০ বছরের পাসপোর্ট প্রয়োজন হয়, তাহলে ১০ বছর মেয়াদি অপশন নির্বাচন করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে ফি বেশি হবে।
ধাপ ৪: আবেদন সাবমিট করুন
সব তথ্য যাচাই করার পর আবেদন সাবমিট করুন। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আবেদনপত্রের কপি সংরক্ষণ করুন। এবার আপনি ৪ হাজার টাকায় পাসপোর্ট পাওয়ার অনেক কাছে পৌছে গেলেন। পরবর্তী ধাপ হলো পাসপোর্টের সরকারি ফি প্রদান।
পাসপোর্টের টাকা কীভাবে দেবেন?
আবেদন করার পর নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ করতে হবে। পেমেন্টের পদ্ধতি আবেদন পোর্টালে প্রদর্শিত অপশন অনুযায়ী (আমার পরামর্শ হলো এ-চালান ব্যবহার করা) পেমেন্ট মেথড নির্বাচন করা যায়। ৪৮ পৃষ্ঠা, ৫ বছর, Regular Delivery-এর সরকারি ফি ৪,০২৫ টাকা। চালান দেওয়া হলে এ চালানের পেমেন্ট রসিদ বা পেমেন্টের প্রমাণ সংরক্ষণ করে রাখুন।

বায়োমেট্রিক দেওয়ার সময় কী হবে?
অনলাইন আবেদন এবং ফি প্রদানের পর মোবাইলে মেসেজ পেলে নির্ধারিত সময়ে রিজিওনাল পাসপোর্ট অফিসে যেতে হবে। সেখানে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি আবেদনকারীর বায়োমেট্রিক তথ্য গ্রহণ করা হবে। তাই অনলাইনে আবেদন করার সময় যে তথ্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে আপনার মূল NID বা জন্মনিবন্ধনের তথ্য মিল থাকা জরুরি যেটা আমি আগেই বলেছি। বেশিরভাগ আবেদন তথ্যে মিল না থাকার কারণে ডিক্লাইন করা হয়।
৪ হাজার টাকায় পাসপোর্ট করতে চাইলে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন
কম খরচে পাসপোর্ট করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত খরচ এড়িয়ে চলা। প্রথমত, দালালের মাধ্যমে আবেদন না করে নিজে অফিসিয়াল পোর্টালে আবেদন করার চেষ্টা করুন। অনলাইনে আবেদন করার নিয়ম জানা থাকলে অন্য কাউকে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে। নাহলে আশেপাশের কম্পিউটার বা অনলাইন সার্ভিসের দোকানে গিয়ে আবেদন করবেন।
দ্বিতীয়ত, দ্রুত পাসপোর্টের প্রয়োজন না থাকলে Express বা Super Express নির্বাচন করবেন না। কারণ দ্রুত ডেলিভারির জন্য সরকারি ফি অনেক বেশি।
তৃতীয়ত, আবেদনপত্রে ভুল তথ্য দেবেন না। নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম এবং ঠিকানার ক্ষেত্রে NID বা জন্মনিবন্ধনের তথ্য অনুসরণ করুন।
চতুর্থত, পাসপোর্টের মেয়াদ ও পৃষ্ঠার সংখ্যা নির্বাচন করার সময় নিজের প্রয়োজন বিবেচনা করুন। শুধুমাত্র কম দামের জন্য এমন ক্যাটাগরি নির্বাচন করবেন না, যা ভবিষ্যতে আপনার জন্য অসুবিধা তৈরি করতে পারে।
৪ হাজার টাকায় পাসপোর্ট করতে চাইলে দালালকে না!
পাসপোর্টের আবেদন অনলাইনে নিজেই করা যায়। সরকারি ই-পাসপোর্ট পোর্টালেই আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে। তাই দালালকে অতিরিক্ত টাকা দিবেন না। তবে কারও অনলাইনে আবেদন করার অভিজ্ঞতা না থাকলে বিশ্বস্ত কারও সহায়তা নিতে পারেন এতে সমস্যা দেখি না।
৪ হাজার টাকা কি মোট খরচ?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার। ৪,০২৫ টাকা হলো ৪৮ পৃষ্ঠা, ৫ বছর মেয়াদি Regular Delivery ই-পাসপোর্টের সরকারি ফি। এর বাইরে আপনার যাতায়াত, ফটোকপি বা প্রয়োজনীয় অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ হতে পারে। তাই বাস্তবে মোট খরচ ৪,০২৫ টাকার চেয়ে সামান্য বেশি হতে পারে। আর আপনি যদি Express বা Super Express সেবা নেন, তাহলে খরচ আরও বেড়ে যাবে।
পাসপোর্ট আবেদনে সাধারণ ভুল
পাসপোর্ট আবেদনের সময় কয়েকটি ভুল প্রায়ই দেখা যায়। যেমন—
- NID-এর তথ্যের সঙ্গে মিল না রেখে নাম লেখা
- জন্মতারিখ ভুল দেওয়া
- বাবা-মায়ের নাম ভুল লেখা
- ঠিকানায় ভুল করা
- ভুল পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন
- পেমেন্টের প্রমাণ সংরক্ষণ না করা
- প্রয়োজনীয় মূল কাগজপত্র না নেওয়া
- আবেদনপত্রের তথ্য যাচাই না করে Submit করা
এসব ভুল এড়িয়ে আবেদন করলে প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ হতে পারে। আশাকরি আপনি বুঝতে পেরেছেন কিভাবে আপনি মাত্র ৪ হাজার টাকায় পাসপোর্ট করবেন। গুরুত্বপূর্ণ: পাসপোর্ট সংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের জন্য সরকারি ই-পাসপোর্ট পোর্টাল ও ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তথ্যকে অগ্রাধিকার দিন। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের হেল্পলাইন হিসেবে দেশের অভ্যন্তর থেকে ১৬৪৪৫ এবং বিদেশ থেকে ০৯৬৬৬৭১৬৪৪৫ নম্বর কল করা যাবে। আসলে আমাদের ওয়েবসাইটে আমরা সহজভাবে প্রতিটি বিষয় বাখ্যা করি ও ধাপে ধাপে আপনাদের বুঝানোর চেষ্টা করি। এতে আপনারা লাভবান হন আর আমরাও সমৃদ্ধ হই। নিচে প্রদর্শিত আর্টিকেলগুলো পড়ে দেখতে পারেন এতে জ্ঞান বাড়বে ইনশাআল্লাহ।

