চাকরির বাজারে একটি ভালো সিভি (CV-Curriculum Vitae) হলো আপনার যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিত্বের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, তাই একটি আদর্শ সিভি তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। নিয়োগকর্তা সাধারণত প্রথমে সিভি দেখেই একজন প্রার্থী সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিয়ে থাকেন। তাই সিভি হতে হবে পরিষ্কার, সংক্ষিপ্ত, তথ্যবহুল এবং যে পদের জন্য আবেদন করছেন তার সঙ্গে মানানসই। টেক্সটাইল কোম্পানীর চাকরিতে যদি আপনি সিমেন্ট কোম্পানীর উপযোগী সিভি দেন তাহলে তো গ্রহণযোগ্য হবে না। যেখানে যেরকম দরকার সেখানে সেরকমই ফোকাস দিতে হবে। তাই এ আর্টিকেল পড়লে আপনি জানতে পারবেন একটি আদর্শ সিভি তৈরির পদ্ধতি।
১. সুন্দর ফরম্যাট নির্বাচন করুন
অতিরিক্ত রং ঢং নেই। আবার তথ্যগুলো গোছানো এমন একটি সুন্দর সিভি ফরম্যাট নির্বাচন করুন। অতিরিক্ত রং ঢং মাখানো সিভিতে তথ্যের চেয়ে যদি ডিজাইনটাতেই আপনি ফোকাস করেন নিয়োগকর্তা বিরক্ত হবে এবং আপনার প্রতি একটা বিরূপ ধারণা আসবে যে আপনি ফুলবাবু। শুধু আউটফিটই আছে কাজের কাজ নেই। সিভির ডিজাইন অতিরিক্ত রঙিন না করে করে আপনার ছবি রঙ্গিন বাঁকি সব কালো কালির ফন্ট দেন, আন্ডারলাইন গ্রে কালির দিতে পারেন। মোটকথা ডিজাইন হালকা হবে যাতে অসুবিধা না হয়। সহজে পড়া যায় এমন ফন্ট ব্যবহার করুন, স্টাইলিশ ফন্ট পরিহার করুন। প্রতিটি অংশের মধ্যে পর্যাপ্ত জায়গা রাখুন, সেকশন হিসেবে ভাগ করুন, যেমন: ব্যক্তিগত তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণের বিবরণ ইত্যাদি আলাদা আলাদা সেকশন হবে। সাধারণত ১–২ পৃষ্ঠার মধ্যে সিভি রাখা ভালো।
২. ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান করুন প্রয়োজনমাফিক
সিভির শুরুতে আপনার নাম, পিতা-মাতার নাম, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, স্থায়ী ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জাতীয়তা ইত্যাদি অবশ্যই দিতে হবে। আর একটা হাজার টাকা দামের পরামর্শ দিব এখন তা হলো প্রতিষ্ঠানভেদে আপনি আপনার ব্যক্তিগত তথ্য সাজাবেন। যেমন আইটি কোম্পানীতে সিভি দিলে আপনি LinkedIn, GitHub প্রোফাইল আইডিও ব্যক্তিগত তথ্য দিতে পারেন। এতে আপনি আইটি রিলেটেড কাজে আছে তা সহজেই বুঝা যাবে। একটি আদর্শ সিভি তৈরির পদ্ধতির এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
৩. ক্যারিয়ার অবজেক্টিভ বা সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল লিখুন
আপনি যে চাকরির জন্য সিভি দিচ্ছেন, সে চাকরি আপনি পাওয়ার যোগ্য কেন সে বিষয়ে আপনার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও কর্মপরিকল্পনা সংক্ষেপে লিখুন। আপনি যোগাযোগ দক্ষতা, কর্ম দক্ষতা, কাজের পরিবেশে মেশার ক্ষমতা ও আপনার বিশেষত্বগুলো সংক্ষেপে ক্যারিয়ার অবজেক্টিভ এ লিখুন। এতে এক নজরে আপনার সম্পর্কে জানা যাবে। আর শিক্ষাগত ও দক্ষতা সেকশন পড়েই আপনার সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যাবে আপনি যোগ্য কিনা? আপনি এখানে পড়ে দেখতে পারেন- পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সেরা ৫ টি কোর্স সম্পর্কে।
৪. শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্রম বিবরণ ধারাবাহিকভাবে লিখুন
সর্বশেষ বা সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা আগে লিখুন। ডিগ্রি বা পরীক্ষার নাম, প্রতিষ্ঠান, বিভাগ/বিষয়, পাসের বছর, বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফলাফল উল্লেখ করতে হবে। জিপিএ ও সিজিপিএ উল্লেখে সতর্ক থাকুন। আপনি যদি বাংলাদেশে কার্যক্রম চালায় এমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ সিভি দেয়ার কথা চিন্তা করেন তাহলে শিক্ষার মাধ্যম: ইংরেজি লেখতে পারেন। কারণ ইংলিশ মিডিয়াম বিদ্যালয়ের স্টুুডেন্ট এক্ষেত্রে বেশি সুবিধা পাবে। আমি কি বলতে চাচ্ছি আশা করছি একটি আদর্শ সিভি তৈরির পদ্ধতি বুঝতে পারছেন।
৫. কাজের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন মাফিক তুলে ধরুন
আপনি শিক্ষা জীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করে থাকতে পারেন। আপনার অনেক অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে আপনাকে সিভিতে সব অভিজ্ঞতা তুলে ধরলে হবে না। এক্ষেত্রে আপনাকে কোন কাজেই অভিজ্ঞ হিসেবে গণ্য করা হবে না। আর আপনি কোন কাজে স্থায়ী নন এটাও বুঝাবে। আপনার অনেক অভিজ্ঞতা থাকা খারাপ না তবে যে চাকরি করতে চাচ্ছেন তার সাথে সামঞ্জস্যশীল অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন। যেমন: ডাটা এন্ট্রির চাকরির জন্য ৩০ শব্দ প্রতি মিনিটে লেখার অভিজ্ঞতা দিতে পারেন কিন্তু আপনি কাপড়ের কাটিং মাস্টার এ অভিজ্ঞতা তো আর সেখানে দেওয়া যাবেনা। কেননা চাকরি তো টেক্সটাইল কোম্পানীর না। আর তাছাড়া টেইলারিং ও কম্পিউটারের অভিজ্ঞতা তো ভিন্ন বিষয়। আপনি দুটো বিষয় জানেন মানে আপনি যে কোন একটি সেক্টরে স্থায়ী ছিলেন না। তাই কাজের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন মাফিক তুলে ধরলে ইতিবাচক হবে আপনার জন্য।
৬. প্রতিটি চাকরির জন্য সিভি আপডেট করুন
আমার উপরের আলোচনা থেকে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন সব প্রতিষ্ঠানে একই সিভি পাঠানো যাবেনা। সব চাকরিতে একই সিভি পাঠানো ভালো পদ্ধতি নয়। যে পদের জন্য আবেদন করছেন, সেই পদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও দক্ষতাগুলো সিভিতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বেশি । চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতার সঙ্গে আপনার বাস্তব দক্ষতার মিল থাকলে তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারলে আপনার চাকরি পাওয়া সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। আপনি যদি এটা সঠিকভাবে এপ্লাই করতে পারেন তাহলে আপনি একটি আদর্শ সিভি তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে গেছেন।
৭. রেফারেন্স (Reference) ও স্বাক্ষর ব্যবহার
আপনার সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রাখে এমন বিশ্বস্ত্ব গণ্যমান্য ও সুপরিচিত দুজন মানুষের রেফারেন্স ব্যবহার করবেন। ইতিবাচক এ কারণে বললাম, যে একটা মানুষ সকলের কাছে ভালো হতে পারে না। দেখা যাচ্ছে শরিষার ভেতরেই ভূত আছে অর্থাৎ আপনি রেফরি হিসেবে যাদের উল্লেখ করলেন সিভিতে তারাই আপনার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দিচ্ছে। তাই সিভিতে আপনার সম্পর্কে ইতিবাচক বলে এমন দুজন মানুষের রেফারেন্স ব্যবহার করুন। আর অবশ্যই রেফরিদের ফোন নম্বর দিবেন। কারণ নিয়োগকর্তা সরেজমিনে না এসেও ফোনেই বেশি যোগাযোগ করে। এবার আসি স্বাক্ষর বিষয়ে। স্বাক্ষর সাম্প্রতিক যেন হয়, সে স্বাক্ষরের সাথে ভাইভা বোর্ডে আপনার স্বাক্ষরের যেন মিল থাকে। পুরো নাম লিখেন আর শর্ট স্বাক্ষর যা-ই করেন না কেন স্বাক্ষর যেন সাম্প্রতিক হয় আর ভাইভা বোর্ডের স্বাক্ষরের সাথে যেন মিল থাকে।


1 thought on “একটি আদর্শ সিভি তৈরির পদ্ধতি”