কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান: বেকারত্বের সমাধান

কারিগরি শিক্ষা নিলে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান কীভাবে বেকারত্ব কমাতে পারে? এখানে আলোচনা করবো সে বিষয়ে। বর্তমান সময়ে বেকারত্ব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। সরকারের এ বছর এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরি কথা থাকলেও উল্টা বেকার হয়েছে ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কিন্তু শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বা তাত্ত্বিক শিক্ষা থাকলেই অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাওয়া সম্ভব হয় না। চাকরির বাজারে বর্তমানে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি যদি আপনার নিজের দক্ষতা না থাকে তাহলে বেকার বসে থাকতে হবে। তাই কারিগরি শিক্ষা নিয়ে নিজেই উদ্যোক্ত হতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান বেকারত্ব কমানোর কার্যকর উপায় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ফ্রিজ মেকানিক, টেইলারিং, অটো সার্ভিস বা মোবাইল সার্ভিসিং কাজের দক্ষতা অর্জন করতে পারেন এবং সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে চাকরির পাশাপাশি অথবা নিজেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। ফলে একজন ব্যক্তি শুধু নিজের বেকারত্ব দূর করেন না, বরং ভবিষ্যতে অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে। আমার এ আইডিয়াগুলো যদি ভালো লাগে তাহলে কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান বিষয়ক পুরো আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন।

কারিগরি / টেকনিক্যাল শিক্ষা কোনটি

কারিগরি শিক্ষা বা টেকনিক্যাল শিক্ষা বা হাতে কলমে শিক্ষা হলো এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে নির্দিষ্ট পেশা / কাজ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক, বাস্তবিক, সমসাময়িক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা শেখানো হয়। কম্পিউটার, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, ওয়েল্ডিং, রেফ্রিজারেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং, অটোমোবাইল, গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল সার্ভিসিং, কৃষি প্রযুক্তি, পোশাক তৈরি, ফুড প্রসেসিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আপনাকে প্রশিক্ষণ পছন্দের কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান দেখবেন হয়ে গেছে।

কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান
চিত্র: কারিগরি শিক্ষা

কারিগরি শিক্ষার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এটি একজন শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করে না; বরং বাস্তব জীবনে কোনো একটি কাজ দক্ষতার সাথে করার জন্য হাতে কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এ শিক্ষাকে আপনি একটি ট্রেইনিং প্রক্রিয়া বলতে পারেন। কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আত্মকর্মসংস্থান কী বিষয়?

আত্মকর্মসংস্থান বলতে নিজের প্রশিক্ষণ হতে প্রাপ্ত জ্ঞান, দক্ষতা, পুঁজি ও উদ্যোগ কাজে লাগিয়ে নিজে নিজেই আয়ের ব্যবস্থা করাকে বোঝায়। যেমন: একজন প্রশিক্ষিত ইলেকট্রিশিয়ান নিজের সার্ভিস সেন্টার চালু করতে পারেন। যেখানে তিনি ওয়্যারিং কাজ পেলে শ্রমিকসহ নিজে ওয়্যারিং করে উপার্জন করতে পারেন। এতে তার পাশাপাশি অন্য দু-দশজনেরও কাজ ও উপার্জনের ব্যবস্থা হবে। একজন গ্রাফিক ডিজাইনার অনলাইনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ নিতে পারেন। একজন ওয়েব ডেভেলপার দেশি-বিদেশি ক্লায়েন্টের জন্য ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারেন। আবার মোবাইল সার্ভিসিং বা ইলেকট্রনিক্সে দক্ষ ব্যক্তি নিজস্ব দোকান বা সার্ভিসিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। এভাবে দক্ষতা ও উদ্যোগের সমন্বয়ে আত্মকর্মসংস্থান তৈরি হয়। তাই আমরা বলে পারি কারিগরি শিক্ষা নিলে, আত্মকর্মসংস্থান মেলে। কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান এক অপরের সাথে জড়িত।

বেকারত্বের সমাধান

বেকারত্বের অন্যতম কারণ হলো চাকরির বাজারের চাহিদা কম, আবার ক্যান্ডিডেটের দক্ষতাও কম। অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না। ফলে শিক্ষাজীবন শেষ করার পর চাকরি খুঁজতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষায় নির্দিষ্ট কাজের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একজন শিক্ষার্থী যদি কম্পিউটার, ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইল, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট বা অন্য কোনো পেশাভিত্তিক বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন, তাহলে তার সামনে চাকরির পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং, ব্যবসা ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ কারিগরি শিক্ষা বেকারত্বের সমস্যাকে শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য তৈরির পাশাপাশি একজন মানুষকে নিজের দক্ষতা ব্যবহার করে আয় করার সক্ষমতা তৈরি করে। আপনি আরও পড়তে পারেন পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সেরা ৫ টি কোর্স

কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান


১. নির্দিষ্ট পেশায় দক্ষতা অর্জন

কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একটি নির্দিষ্ট পেশার জন্য প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হবেন। যেমন—ইলেকট্রিশিয়ান, কম্পিউটার অপারেটর, টেইলার মাস্টার, মেকানিক, টেকনিশিয়ান বা মোবাইল বা ল্যাপটপ সার্ভিসিং কর্মী। একটি নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতা অর্জন করলে চাকরির পেলে পেলেন অথবা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। বর্তমানে কিন্তু ইলেকট্রনিক গ্যাজেট মানুষ বেশি ব্যবহার করছে ফলে ইলেকট্রনিক গুডস সার্ভিসিং সেক্টরে কিন্তু প্রচুর টেকনিশিয়ানের চাহিদা রয়েছে। আবার আপনি আরেকটি কাজ করতে পারেন তা হলো ইলেকট্রিক টেকনিশিয়ানের প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি অর্ডার দেওয়ার ওয়েবসাইট খুললেন, সেখানে মানুষ অর্ডার দিলে বাড়িতে গিয়ে ইলেকট্রনিক গুডস সার্ভিসিং করে দিলেন। এ আইডিয়াটা প্রিমিয়াম আমি আপনাকে বলে দিলাম।


২. স্বল্প পুঁজিতে কাজ শুরু করার সুযোগ

ধরুন, আপনি যদি মোবাইল সার্ভিসিং এর দোকান দিতে চান সব মিলেয়ে আপনার ৫০ হাজার টাকার যন্ত্রপাতি কিনলেই হয়ে যাবে। তাহলে কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে। সব ধরনের ব্যবসা শুরু করতে বড় অঙ্কের পুঁজি প্রয়োজন হয় না। অনেক কারিগরি পেশায় তুলনামূলক কম পুঁজি দিয়ে কাজ শুরু করা সম্ভব। যেমন মোবাইল বা কম্পিউটার সার্ভিসিং, ইলেকট্রিক্যাল সার্ভিস, টেইলারিং বা বিভিন্ন মেরামতসেবা ছোট পরিসরে শুরু করা যায়। পরে আল্লাহ পাক বরকত দিলে দেখবেন আপনি একজন বড় উদ্যোক্ত হয়ে গেছেন। আশা করছি আপনি বুঝতে পারছেন কেন এ আর্টিকেলের টাইটেল কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান: বেকারত্বের সমাধান। আবার আপনি যদি ইলেকট্রিক বা প্লাম্বিং মিস্ত্রি হতে চান তাহলে আপনাকে ৩ হাজার টাকার ড্রিল মেশিন, ২ হাজারের মধ্যে থ্রেট কাটিং ডায়োস, হাতুড়ি, স্ক্রু ড্রাইভার, ছেউনি, ৭ হাজারের মধ্যে ওয়াল কাটিং মেশিন, ৩ হাজারের মধ্যে গ্রাইন্ডার মেশিন মোট ১৫ হাজারে যন্ত্রপাতি কিনলেই কিন্তু ইলেকট্রিক বা প্লাম্বিং কাজ শুরু করে দিতে পারেন। এটা আমি একটা ধারণা দিলাম আপনি প্রশিক্ষণ শুরু করলে সামগ্রিক ধারণা পাবেন। অর্থাৎ যে বিষযে শিখতে চান সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাবেন।

৩. ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুযোগ

ঘরে বসে দেশ বিদেশের কাজ অনলাইনে করা হলো ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্তশ্রম। যে শ্রম দিবেন আপনি আপনার সুবিধা মত। একটি গ্রাফিক ডিজাইন কাজ পেলেন যা ২ দিনের মধ্যে দিতে হবে, আপনি যখন সময় পাবেন দুইদিনের মধ্যে কাজটি করলেই হলো। ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ভিডিও এডিটিং, ডেটা এন্ট্রি এবং সফটওয়্যার-সংক্রান্ত বিভিন্ন দক্ষতা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে কাজে লাগানো যায়। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। এখানে আবার আরেকটা উপকারিতা আছে তা হলো উন্নত দেশের টাকার মান বেশি , বিদেশের অল্প টাকাও এ দেশে ভাঙ্গালে বেশি টাকা হয়ে যাবে। তাই কাজ ছোট হোক বড় হোক করতে হবে। ছোট কাজ বলে অবহেলা করবেন না। তাহলে কাজে লাগবে কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আপওয়ার্ক, ফ্রিল্যান্সার, ফাইভার হলো বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং প্লাটফর্ম। এগুলোতে আপনি দক্ষতা অর্জন করার পর একাউন্ট খুলে দেশ বিদেশের কাজ করতে পারেন। তবে একটি সাবধান বার্তা তা হলো: বাংলাদেশের অনেক অদক্ষ মানুষ আপওয়ার্ক, ফ্রিল্যান্সার, ফাইভারে একাউন্ট খুলে কাজ পায়না পরে হতাশ হয়ে বলে বাংলাদেশীদের কাজ দেয় না। এটা আসলে ঠিক না। দক্ষ মানুষের কদর সবসময়ই ছিল।

ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠার গড়ে তোলার সুযোগ

কারিগরি দক্ষতা একজন ব্যক্তিকে ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে দিতে পারে। যেমন একজন ব্যক্তি দুই ধরণের সেলাই মেশিন কিনে নিজে নিজেই টেলারিং শুরু করে দিতে পারে। পরে সে ব্যক্তি অন্যদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমেও পরিণত হতে পারে। এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানেও পরিণত হতে পারেন। যেমন ভারতের বিখ্যাত ব্র‌্যান্ড রেমন্ড। তারা কিন্তু বাংলাদেশে টেইলারিং ও কাপড় বিক্রির ব্যবসা করে। বিশাল বড় প্রতিষ্ঠান। সেখানে আধুনিক সুযোগ সুবিধা আছে। আপনি অত বড় হতে না পারেন চেষ্টা করে দেখতে পারেন একটি টেইলারিং ব্র‌্যান্ড প্রতিষ্ঠার।

তরুণ সমাজ যদি সঠিক প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করে ইনশাআল্লাহ উপরওয়ালা তাকে হতাশ করবেনা। বরং সে ব্যক্তি দক্ষ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাহলে কাজে লাগবে কারিগরি শিক্ষা ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

Leave a Comment