আসল ও নকল চাকরির বিজ্ঞাপন কিভাবে চিনবেন?

বর্তমান যুগ অনলাইনের যুগ। বিভিন্ন চাকরির আবেদন সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে পাওয়া যায় বা বিভিন্ন পোর্টালে এ্যাড হিসেবে দেখা যায়। আবার অনলাইনে হোয়াটসএ্যাপ বা টেলিগ্রামেও চাকরির আবেদন করার লিংক পাওয়া যায়। কিন্তু আসল ও নকল চাকরির বিজ্ঞাপন আপনি কি চেনেন? আসল ও নকল চাকরির বিজ্ঞাপন চেনার উপায় নিয়েই আজ আলোচনা করবো। ধৈর্য ধরে পুরো আর্টিকেলটি পড়েন আপনার জীবনে নানা উপকারে আসবে আর আপনিও সচেতন হবেন।

আসল ও নকল চাকরির আবেদন চেনা কেন জরুরী?

আসল ও নকল চাকরির বিজ্ঞাপন এ জন্য জরুরী যে নকল চাকরির প্রলোভনে বা ফাঁদে পা দিয়ে অনেকে সর্বশান্ত হচ্ছে, টাকা হারাচ্ছে, গুম হচ্ছে এমনকি ধর্ষিতও হচ্ছে। কি বিশ্বাস হচ্ছে না! তাহলে দু-একটা ঘটনা বলি। বাইং হাউজ বা গার্মেন্টস পণ্য সেল হাউজে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে এক লোক আবেদন করে, পরে ফোন দিয়ে তাকে কামারপাড়া, উত্তরা নির্জন একটি ফ্ল্যাটে ডেকে নেওয়া হয়, পরে তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে প্রতারক চক্র মুক্তিপন চেয়ে ক্যান্ডিডেটের বাড়ীতে ফোন দেয়। পরে কৌশলে পুলিশ যেয়ে তাকে উদ্ধার করে। আবার অনেক সময় চাকরির সিকিউরিটি মানি চেয়ে প্রতারণা করে। গাজীপুর চৌরাস্তা সংলগ্ন এলাকায় এসব প্রতারক চক্র বেশি সক্রিয়। এসব ঘটনা থেকে আমরা কি শিক্ষা লাভ করবো না যে আসল ও নকল চাকরির বিজ্ঞাপন চেনা কেন জরুরী।

প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানে ওয়েবসাইট চেকিং

একটি চাকরির বিজ্ঞাপনে দেখা গেল “গ্রামীনফোন কোম্পানির টাওয়ারে নিজ এলাকায় চাকরি। যোগ্যতা: এইচএসসি পাস, বেতন: ২৫,০০০/- টাকা। শর্ত: নিজ এলাকায় চাকরির মানসিকতা থাকতে হবে। সাপ্তাহিক ছুটি নেই। দিনে ৮ ঘন্টা ডিউটি করতে হবে। মাসিক ৫ ছুটি। শর্ত: চাকরির সিকিউরিটি মানি: ১০,০০০/- টাকা নিম্নলিখিত নম্বরে অগ্রিম পাঠাতে হবে।” এমন চটকদার চাকরির বিজ্ঞাপন দেখলে যে কেউ আবেদন করতে চাইবে। কিন্তু এটা প্রতারণা মূলক চাকরির বিজ্ঞপ্তি। প্রতারক দের নম্বরে টাকা পাঠালে আর ফেরত পাবেন না। তাই চাকরির বিজ্ঞাপন দাতা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট চেকিং করা জরুরী। গ্রামীনফোন যদি বিজ্ঞপ্তি দেয় তাহলে তাদের ওয়েবসাইটে দিবে কিন্তু অন্য ওয়েবসাইট বা ই-মেইল দেওয়া থাকলে সে চাকরির আবেদন করা যাবে না। যে প্রতিষ্ঠানের চাকরির বিজ্ঞপ্তি তা সে প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে কিনা দেখে নিশ্চিত হতে হবে। এখনকার বড় বড় কোম্পানী কিংবা প্রতিষ্ঠানে Career নামে একটা মেনু থাকে সেখানে চাকরির বিজ্ঞপ্তিগুলো প্রকাশিত হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরির বিজ্ঞপ্তি চেকিং করার ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটের শেষে .gov.bd আছে কিনা লক্ষ্য রাখতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান অনেক সময় .teletalk.com.bd থেকে বিজ্ঞপ্তি দেয়, সেক্ষেত্রে লিংক ভালোভাবে চেক করতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান বিকাশে টাকা পাঠাতে বলে তাদের বিজ্ঞপ্তি ভালোভাবে যাচাই করতে হবে, প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ই-মেইলে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হতে হবে।

চটকদার বিজ্ঞাপন যাচাই করা

বিভিন্ন চটকদার ও আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন তৈরির মাধ্যমে প্রতারকচক্র চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষতি সাধন করতে পারে। যেমন: ১৮ বছর পর এবারই চাকুরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, জাহাজে ক্র হিসেবে ২৫,০০০ লোক নিবে, বেতন: ২০০০০ হাজার টাকা মাস। যোগ্যতা: এসএসসি পাস। এরকম কম যোগ্যতার বেশি বেতন দিয়ে ২৫ হাজার লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিলে অনেক মানুষ আবেদন করবে। আর প্রতারক চক্র চাকরির আবেদন ফি’র টাকাগুলো আত্মসাৎ করবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের অফিসিয়াল লোগোযুক্ত ও যথাযথ ফরম্যাটে চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে থাকে। তাই বিজ্ঞপ্তি কোথা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে, সঠিক ফরম্যাটে হচ্ছে কিনা? বা লোগো ঠিকঠাক আছে কিনা তা নিশ্চিত হবে। উপরন্তু আপনি যখন চমকপ্রদ কোন বিজ্ঞাপন দেখবেন তখন তা অবশ্যই যাচাই করে নিবেন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে। প্রয়োজনে হেল্পলাইনে ফোন করে জানবেন।

চিত্র: একটি ভুয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তি, যেখানে লোগো ও প্রতিষ্ঠানের নামের ভারসাম্য নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরির আবেদন ওয়েবসাইট ও চিঠির মাধ্যমে করতে বলা হলেও এখানে ই-মেইলের মাধ্যমে আবেদন করতে বলা হয়েছে।
চিত্র: একটি ভুয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তি, যেখানে লোগো ও প্রতিষ্ঠানের নামের ভারসাম্য নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরির আবেদন ওয়েবসাইট ও চিঠির মাধ্যমে করতে বলা হলেও এখানে ই-মেইলের মাধ্যমে আবেদন করতে বলা হয়েছে।

কম যোগ্যতায় উচ্চ বেতন

চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠান/ কোম্পানীর পে-স্কেল নীতিমালা অনুযায়ী পদ অনুসারে বেতন হয়ে থাকে। কিন্তু আপনি যদি লক্ষ্য করেন অল্প শিক্ষাগত যোগ্যতায় বেশি বেতন তাহলে তা নকল চাকরির আবেদন কিনা অবশ্যই যাচাই করতে হবে। মোবাইল টাওয়ারের সিকিউরিটি গার্ডের বেতন বড় কর্মকর্তার বেতনের সমান হলে অবশ্যই তা সন্দেহযুক্ত চাকরির বিজ্ঞাপন। তাছাড়া এইচএসসি পাশে নিজ এলাকায় চাকরি, বিভিন্ন এনজিওতে কম যোগ্যতায় চাকরি এসব বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হবেন না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করে এমন প্রতিষ্ঠান কখনোই আপনাকে নিজ এলাকায় পোস্টিং দিবেনা। সুতরাং কম যোগ্যতায় বেশি বেতন ও নিজ এলাকায় চাকরির বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হবে না।

পেমেন্ট মেথড নিয়ে সতর্কতা

সরকারি চাকরিতে আবেদন ফি সাধারণত চালান, এ-চালান অথবা টেলিটকের একাউন্ট ব্যালেন্স থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়। আর বেসরকারি চাকরিতে বাংলাদেশের স্বনামধন্য চাকরির পোর্টাল বিডিজবস কিংবা কোম্পানী/প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইটে Career সেকশনে চাকরি প্রার্থীর প্রোফাইল তৈরির মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। যেখানে কোন আবেদন ফি লাগে না। বেসরকারি চাকরিতে যেটা লাগে অনেকক্ষেত্রে তা হলো জামানত। সেটাও লাগে ভাইভা হওয়ার পর। সুতরাং কোন চাকরির বিজ্ঞাপনে যদি বিকাশ, নগদ, ই-মেইল, মানি ট্রান্সফার, ব্যাংক চেক, বিটকয়েন কিংবা কার্ড থেকে টাকা পেমেন্ট করার অপশন দেয় তাহলে অবশ্যই সে চাকরির বিজ্ঞপ্তি সাবধানতার সাথে ভেরিফাই করতে হবে।

ভুল বানান, অস্পষ্ট তথ্য ও ফন্ট স্টাইল ভিন্ন হওয়া

সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে ভুল বানান, বিভ্রান্তিকর তথ্য কিংবা স্টাইলিশ ফন্ট ব্যবহার করেনা। আপনি যদি কোন চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে স্টাইলিশ ফন্ট দেখেন তাহলে ঐ প্রতিষ্ঠানের পূর্বের চাকরির বিজ্ঞপ্তিগুলো একবার চেক করে নিবেন। কোন স্টাইলে এবং কোন ফন্টে তারা পূর্বের চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। নিচের একটি ভুয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখুন যেখানে সরকারি নিয়োগ ভিন্ন স্টাইলিশ ফন্টে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বেতনস্কেল উল্লেখ না করে সরাসরি বেতনের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সরকারি চাকরিতে বেতনস্কেল ১৩তম গ্রেড বা ১৪ তম গ্রেড এভাবে উল্লেখ থাকে।

চিত্র: একটি ভুয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তি।
চিত্র: একটি ভুয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তি।

ভাইভার পূর্বে টাকা চাওয়া

ভাইভার পূর্বে কোন প্রতিষ্ঠান আপনার কাছে জামানতের টাকা চাইবে। কারণ ভাইভার আগে আপনি চাকরি পেলেন কি পেলেন না নিশ্চিত হওয়া যায় না। তাই ভাইভার আগে যদি রেজিস্ট্রেশন ফি, জামানত, প্রশিক্ষণ ফি বা অন্য কোনো অগ্রিম টাকা দাবি করা হয়, তাহলে অতিরিক্ত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তখন যে প্রতিষ্ঠানের নামে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে, তাদের ওয়েবসাইট দেখে বা তাদের কাছে ফোন করে নিশ্চিত হতে হবে যে চাকরির বিজ্ঞপ্তিটি সঠিক কিনা।

1 thought on “আসল ও নকল চাকরির বিজ্ঞাপন কিভাবে চিনবেন?”

Leave a Comment